জাকিয়া জিতু
প্রকাশ: ০২:০৩, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিবি রাসেল । ছবি: এআই/টিবিআই
আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘সফল হওয়ার চেষ্টা করার বদলে দক্ষ হওয়ার চেষ্টা করো। সাফল্য এমনি আসবে।’ তেমনি নব্বইয়ের দশকে হাতেগোনা কয়েকজনের কঠোর পরিশ্রমের ফলে আমাদের মাতৃভূমির নাম সর্বলোকে হয়ে উঠেছিল দেদীপ্যমান। দেশ-বিদেশে যখন প্লাস্টিক, পলিয়েস্টার ও সিনথেটিক তন্তুর বিরূপ প্রভাব পড়েছিল, ঠিক সেই সময় প্রাকৃতিক তন্তু দিয়ে নিজেদের কৃতিত্ব প্রমাণের খাতায় অগ্রজ হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন বিবি রাসেল।
শেডস অব ব্লু থেকে কাঁচা হলুদ, পাকা ধানখেতের সেই আগুনে অরেঞ্জ থেকে কচি কলাপাতা—‘সোনার বাংলার’ নদীনালা, আকাশে ছুঁয়ে থাকা নীল রঙের ছড়াছড়িতে কখনো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে বন্ধুর মতো, আবার বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য আর লোকায়ত সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছিলেন পরিচিত মুখ বিবি রাসেল।
তবে এ পর্যন্ত আসার গল্পটা কিন্তু এতটা সহজ ছিল না। ছোটবেলায় বিবির মা শামসুন্নাহার রহমান তিন বোনের জন্য যে জামা সেলাই করে দিতেন, তা ঠিক তার মনঃপূত হতো না। পরে তার বাবা মোখলেসুর রহমান সিধু ১০ বছর বয়সি কন্যার জন্য একটি সেলাই মেশিন কিনে এনেছিলেন। তাতেই বিবি রাসেল নিজের পছন্দমতো জামা সেলাই করতে শুরু করেন। ড্রেসগুলোকে অভিনব করতে রান্নাঘরের হলুদ রং ব্যবহার করে সবাইকে অবাক করে দিতেন সেদিনের সেই ছোট্ট বিবি।
এরপর কোকো শ্যানেলের ছবিওয়ালা ম্যাগাজিনের পাতায় চোখ বোলাতে বোলাতেই ষোলো বছরের কিশোরীমনে ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্ন তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ‘কলেজ অব ফ্যাশন’ থেকে প্রথম বাংলাদেশি ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে তিনি গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি অর্জন করেন।
গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর বিবিকে তার প্রফেসর বিখ্যাত মডেল এজেন্ট ল্যারেইন এশটনের সঙ্গে মডেলিংয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন। মডেলিংয়ের কোনো ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও ফ্যাশনজগত সম্পর্কে ভালোভাবে জানার জন্য তিনি কাজে আগ্রহী হন।
তবে লন্ডনের জীবনযাত্রা বেশ ব্যয়বহুল হওয়ায় পড়াশোনার সময় প্রতিদিন ভোর ৪টা নাগাদ উঠে প্রস্তুতি নিতে হতো। সারা দিন অতিরিক্ত ক্লাস করে রাতে ফিরতেন। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে তাকে চিঠি বিলির কাজও করতে হয়েছে। যদিও এসবের কথা তিনি দেশে তার বাবা-মাকে কখনোই জানাননি।
তার প্রথম মডেলিং ছিল ইতালীয় ডিজাইনার ভ্যালেন্তিনোর সঙ্গে। তিনিই প্রথম হার্পারস বাজারের জন্য মডেলিং করেন। একই সময়ে তিনি অন্যান্য নামিদামি মডেলের সঙ্গে র্যাম্পে অংশ নিতে থাকেন। তামাটে রং, লম্বা চুল আর প্রাচ্যের সংস্কৃতির মিশ্রণে সে সময় তিনি বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাজ করেন। এর মধ্যে টয়োটা ও জাগুয়ারের জন্য করা মডেলিং ছিল অন্যতম।
৫ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতার এই মডেল অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তার কাজের প্রতি আগ্রহ ও বুদ্ধিদীপ্ততার জন্য পরিচিত হয়ে যান। কাজের প্রতি ডেডিকেটেড থাকা এবং নিত্যনতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কার করতে তিনি ভালোবাসতেন। তার প্রমাণ মেলে একটি শ্যাম্পুর মডেলিংয়ের সময়। সেখানে তিনি সুইমিংপুলের উঁচু জাম্পবোর্ড থেকে লাফ দিয়েছিলেন। এ ধরনের কাজ আগে না হওয়ায় তাকে টানা ১০ দিন অনুশীলনও করতে হয়েছিল।

১৯৯২ সাল থেকে একটানা ১৬ বছর তিনি ছিলেন ভোগ, হারপারস বাজার এবং কসমোপলিটনের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মডেল। বিশ্বের অভিজাত প্রায় সব ব্র্যান্ডের অ্যাম্বাসেডর হিসেবে ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছেন। কিন্তু দেশীয় বস্ত্র ও হস্তশিল্প নিয়ে কাজ করার একান্ত আকাঙ্ক্ষা তাকে ফিরিয়ে আনে বাংলাদেশে।
১৯৯৫ সালের ১৩ জুলাই দেশে গড়ে তোলেন ‘বিবি প্রডাকশন’। বিবি প্রডাকশনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ফ্যাশন, বস্ত্রশিল্প ও হস্তশিল্পের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। ইউরোপীয় মডেলিং ও ফ্যাশন ডিজাইনিং জগতের পিছুটান ছেড়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত তাঁতপল্লিতে গিয়ে গামছা, খাদি কিংবা জামদানির মতো দেশীয় বস্ত্র সংরক্ষণ ও উন্নয়নে মনোযোগ দেন। মনোযোগ দেন দেশীয় হস্তশিল্পকে বিশ্ববাজারে পরিচয় করিয়ে দিতে। চেষ্টা চালিয়ে যান মসলিনের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে।
তিনি মনে করেছিলেন, বাংলাদেশের হস্তশিল্পীদের হাতে জাদু আছে। দেশের আনাচকানাচে ঘুরে বেড়িয়ে তিনি তাঁতিদের খোঁজখবর করতে থাকেন। শুধু দেশেই নয়, ভারত, শ্রীলঙ্কা, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, ডেনমার্ক ও কম্বোডিয়ার মতো দেশের তাঁতিদের নিয়েও তিনি কাজ করেছেন।
ইউনেসকোর সহায়তায় ১৯৯৬ সালে ‘উইভারস অব বাংলাদেশ’ নামে বিবি প্রডাকশন প্রথম ফ্যাশন শো করে প্যারিসে। ইউনেসকোর সহায়তায় তিনি ইউরোপে আরও অনেক বড় শো করেন। জাতিসংঘের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কম্বোডিয়ায় এইচআইভি পজিটিভ নারীদের সঙ্গে এবং স্পেনের কারাগারে সাজাপ্রাপ্ত বন্দি নারীদের সঙ্গে নিয়ে ‘ফ্যাশন ফর ডেভেলপমেন্ট’ থিমে কাজ করেছেন।
২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি ‘দ্য ক্রস অব অফিসার অব দ্য অর্ডার অব কুইন ইসাবেলা’ (The Cross of Officer of the Order of Queen Isabela) পুরস্কারে ভূষিত হন। বিবির একমাত্র লক্ষ্য ফ্যাশনের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন। হাতে বোনা খাদি, মসলিন, জামদানি ও উন্নত মানের সুতি কাপড়ের ব্যবহারে তার ডিজাইন ও ফ্যাশন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে অন্য রকম মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে।
ইউরোপের বিশ্বসেরা আটটি ব্র্যান্ড—আরমানি, ভেলেন্তিনো, পল স্মিথ, কেলভিন ক্লেইন, হুগো বস, ম্যাক্স মারা ও লরেন ব্র্যান্ডের পাশাপাশি ‘বিবি রাসেল’ নামের ব্র্যান্ডও ফ্যাশনপ্রেমীদের কাছে এক পরিচিত নাম।
একজন সাধারণ নারী থেকে কীভাবে অসাধারণ নারীতে পরিণত হওয়া যায়, তার জলজ্যান্ত উদাহরণ তিনি। যিনি কিনা কাঁপিয়ে-দাপিয়ে বেরিয়েছেন খ্যাতির শিখরে, বাংলাদেশকে বসিয়েছেন সম্মানের আসনে। তৃতীয় বিশ্বের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে কাজ করেছেন পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। আজও যেসব নারী তাদের ক্যারিয়ার, যশ বা খ্যাতির স্বর্ণশিখরে পৌঁছাতে চান, তারা তাকে তাদের আইডল মনে করেন—উদ্যোক্তা, ফ্যাশন ডিজাইনার ও মডেল বিবি রাসেলকে।
জাকিয়া জিতু: আইনজীবি ও সংস্কৃতিকর্মী