নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩:১০, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
খাতসংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদরা একে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখলেও, ঋণের প্রকৃত ব্যবহার নিশ্চিতকরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি এবং বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নে নীতিগত সহায়তার ওপর জোর দিচ্ছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে টেকসই প্রকল্পে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট অর্থায়নের স্থিতি ছিল ৮৩ হাজার ৭৪৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬ হাজার ৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। অর্থাৎ, তিন মাসে টেকসই প্রকল্পে অর্থায়ন বেড়েছে ১২ হাজার ২৫৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে টেকসই খাতে ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ৮৮৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা। একই সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ খাতে অর্থায়ন করেছে ৩ হাজার ১৪৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফিন্যান্স পলিসির আওতায় ব্যাংকগুলো টেকসই অর্থায়নের ১১টি ক্যাটাগরিতে মোট ৬৮টি পণ্যের বিপরীতে ঋণ দিতে পারে। এসব পণ্যের বড় একটি অংশ পরিবেশবান্ধব বা সবুজ অর্থায়নের আওতায় পড়ে।
টেকসই অর্থায়নের আওতায় কৃষি, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই), পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা ও সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের একটি নির্দিষ্ট অংশ টেকসই অর্থায়নে রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সবুজ অর্থায়নের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি), পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদনসহ বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ দেওয়া হয়। পরিবেশবান্ধব এসব প্রকল্পে ব্যাংকগুলোকে মোট মেয়াদি ঋণের নির্দিষ্ট অংশ অর্থায়নের নির্দেশনাও রয়েছে।
সবুজ প্রকল্পেও বেড়েছে অর্থায়ন: বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে সবুজ প্রকল্পে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ১৯৬ কোটি ৭ লাখ টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ১৫৮ কোটি ২০ লাখ টাকা। ফলে তিন মাসে সবুজ প্রকল্পে অর্থায়ন বেড়েছে ৯৬২ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সবুজ প্রকল্পে ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ১০৪ কোটি তিন লাখ টাকা। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ খাতে অর্থায়ন করেছে এক হাজার ৫৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
বেড়েছে ঋণ আদায়ও: শুধু নতুন করে ঋণ বিতরণ নয়, টেকসই ও সবুজ প্রকল্প থেকে ঋণ আদায়ের পরিমাণও বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো টেকসই অর্থায়ন থেকে ৫২ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা ঋণ আদায় করে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আদায়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ, তিন মাসে টেকসই খাতে ঋণ আদায় বেড়েছে ১৮ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা।
একই সময়ে সবুজ প্রকল্প থেকেও ঋণ আদায় বেড়েছে। বছরের প্রথম প্রান্তিকে এ খাতে আদায় হয়েছিল পাঁচ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৮৮৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এতে তিন মাসে সবুজ প্রকল্পে ঋণ আদায় বেড়েছে প্রায় ৮৪৬ কোটি টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেকসই ও সবুজ খাতে ঋণ বিতরণের পাশাপাশি আদায় বাড়া ইতিবাচক। তবে এ খাতের প্রকল্পগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় বিনিয়োগের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত আর্থিক ও পরিবেশগত সুফল পেতে সময় লাগে।
তাদের মতে, প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ ও বাজার সম্ভাবনা যাচাই করে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে আরও সতর্ক হতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত সমস্যায় থাকা উদ্যোক্তাদের জন্য বাস্তবসম্মত পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
শিল্প উদ্যোক্তা ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের কারণে দেশে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ অনুকূল নয়। উৎপাদন কমে যাওয়ায় বড় বড় কারখানা ঋণ পরিশোধ নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছে। ফলে বড় উদ্যোক্তাদের নতুন ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কমছে। অনুকূল পরিবেশ হলে ঋণ গ্রহণ ও আদায় বহুগুণ বেড়ে যাবে।’
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও ব্যাংক খাত বিশ্লেষক হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ‘টেকসই অর্থায়ন বাড়া ইতিবাচক। তবে ঋণের অর্থ প্রকৃত সবুজ ও টেকসই প্রকল্পে যাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা প্রয়োজন।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবদুল বায়েস বলেন, কাগজে-কলমে প্রকল্পকে ‘সবুজ’ দেখিয়ে ঋণ নেওয়ার সুযোগ ঠেকাতে কঠোর নজরদারি দরকার। ঋণ দেওয়ার আগে প্রকল্প যাচাই এবং পরে অর্থের ব্যবহার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
টিবিআই/আরআর