১৭ কার্তিক ১৪৩৩, নভেম্বর ২, ২০২৬

চতুর্থবার ক্ষমতায় বসছেন

ব্রাজিলে লুলা দা সিলভার নাটকীয় জয়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১০:৫৩, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

ব্রাজিলে লুলা দা সিলভার নাটকীয় জয়

ছবি: সংগৃহীত

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা নির্বাচনে নাটকীয় জয় পেয়েছেন। কট্টর ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে তিনি ঐতিহাসিকভাবে চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় বসছেন। বিজয়ী ভাষলে লুলা বলেছেন, তার জয়ে গণতন্ত্র সুরক্ষিত হয়েছে।  

প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, ৮০ বছর বয়সী এই বামপন্থী নেতা পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৭৫ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে তার ৪৫ বছর বয়সী প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট।

অক্টোবরের শুরুতে নির্বাচনের প্রথম ধাপে বলসোনারোর কাছে অল্প ব্যবধানে হেরে গিয়েছিলেন লুলা। এতে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। আর প্রগতিশীল ব্রাজিলীয়রা তিন সপ্তাহের জন্য হতাশ হয়ে গিয়েছিলেন।

আশির দশকে গণতন্ত্র ফিরে আসার পর এমনটা আর কখনোই হয়নি। প্রথম ধাপে দ্বিতীয় হওয়া কোনো প্রার্থী এর আগে দ্বিতীয় ধাপে জিততে পারেননি।

কিন্তু রোববার লুলা ঠিক সেই অসম্ভব কাজটাই করে দেখিয়েছেন। এতে সাও পাওলোর রাস্তায় আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। সেখানকার একটি হোটেলে বসেই তিনি ভোট গণনা দেখছিলেন।

লুলার অন্যতম প্রধান মিত্র রেজিনাল্ডো লোপেস দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছে। এর মধ্য দিয়ে ব্রাজিল বিশ্বকে জানিয়ে দিল যে কট্টর ডানপন্থীরা হলো ফ্যাসিবাদী। তারা কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে, গরিবদের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এবং সমকামীদের বিরুদ্ধে। আমরা এই দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে  নতুন করে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছি।

তিন সপ্তাহ আগে ব্রাজিলের এই প্রেসিডেন্ট ২২ লাখ ভোটে পিছিয়ে ছিলেন। কিন্তু এবার তিনি ৪৩ লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।

লুলা তার সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার মধ্য দিয়েই এই বিশাল ব্যবধান গড়ে তুলেছেন। তার মিত্ররা এটিকেই সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন।

প্রথম ধাপে ভোট না দেওয়ার হার ছিল রেকর্ড ২১ দশমিক ০৮। এর মাঝে লুলার ভোটাররাই বেশি বলে ধারণা করা হয়। কারণ, তারা ভোটকেন্দ্র থেকে বেশ দূরে থাকেন। তবে দ্বিতীয় ধাপে ভোট না দেওয়ার এই হার কমে ১৯ দশমিক ২১–এ নেমে আসে।

মঙ্গলবার লুলার বয়স ৮১ বছর পূর্ণ হবে। এই জয় তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের চূড়ান্ত অধ্যায়। সত্তরের দশকের শেষের দিকে সাও পাওলোর শিল্প শহরতলিতে একজন শ্রমিকনেতা হিসেবে তার এই জীবন শুরু হয়েছিল।

গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন লুলা। রাজনীতিতে আসার পর ১৯৮৯, ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালে টানা তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। ২০০২ সালে তিনি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনিই শ্রমিক শ্রেণি থেকে উঠে আসা প্রথম প্রেসিডেন্ট।  

সংবিধান অনুযায়ী, টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পর লুলা পদত্যাগ করেছিলেন। তবে ২০২২ সালের নির্বাচনে বলসোনারোর বাবা এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোকে হারিয়ে তিনি আবারও ক্ষমতায় ফেরেন। পরে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করার অপরাধে জইর বলসোনারোকে কারাগারে পাঠানো হয়।

লুলার এই জয় বলসোনারোর জন্য একটি দুঃসংবাদ।  তিনি এখন ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তিনি আশা করেছিলেন যে ছেলে জিতলে তিনি হয়তো মুক্তি পাবেন এবং সরকারে কোনো পদ পাবেন।

লুলার জয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও একটি বড় ধাক্কা। তিনি বলসোনারো পরিবারের মিত্র। ট্রাম্প আশা করেছিলেন, লাতিন আমেরিকায় তার সমর্থক নেতাদের তালিকায় বলসোনারোও যুক্ত হবেন।

লুলার জয়ের খবর নিশ্চিত হওয়ার পর ব্রাসিলিয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। সেখানেই বলসোনারো গৃহবন্দী অবস্থায় আছেন এবং তার ছেলে সেখান থেকেই ভোট গণনা দেখছিলেন।

গত শনিবার লুলার সমর্থকেরা দুটি বিশাল শোডাউন করেন। রিও ডি জেনিরোর কোপাকাবানা সৈকতে ১০ লাখের বেশি মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। এর চেয়েও বেশি মানুষ সাও পাওলোর প্রাণকেন্দ্র পাওলিস্তা অ্যাভিনিউতে মিছিল করেন।

রোববার সন্ধ্যায় লুলার শত শত সমর্থক ভোট গণনা দেখতে আবারও পাওলিস্তা অ্যাভিনিউতে ফিরে আসেন। তখন তারা লুলার ছবিযুক্ত লাল পতাকা ওড়াচ্ছিলেন।

বিজয়ী ভাষণে লুলা বললেন, গণতন্ত্র সুরক্ষিত হয়েছে: এদিকে বিজয়ী হওয়ার পর ভাষণে লুলা দা সিলভা বলেছেন, তিনি পুনর্নির্বাচিত হওয়ায় দেশের গণতন্ত্র সুরক্ষিত হয়েছে। এ নির্বাচনে নেতিবাচকতা ও মিথ্যার পরাজয় হয়েছে।

সাও পাওলোতে উৎফুল্ল সমর্থকদের সমাবেশে দেওয়া বিজয়ী ভাষণে লুলা এ কথাগুলো বলেন। লুলা তার ভাষণে বলেন, দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে আমি সবার সঙ্গে মতৈক্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করব।

ব্রাজিলের জনগণের নির্বাচিত কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করবেন বলেও জানান লুলা। তিনি বলেন, আমার সরকার হবে ব্রাজিলের সব মানুষের জন্য।

লুলা বলেন, আমার নির্বাচনী প্রচার মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে পেরেছে যে গণতন্ত্র রক্ষায় ভোট দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আহ্বান জানান লুলা। তার ভাষ্য, এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিদেশি হস্তক্ষেপের চেষ্টা হয়েছিল, যা ব্রাজিল প্রতিহত করেছে।

বিজয়ী ভাষণে লুলা আবার জোর দিয়ে বলেন, ব্রাজিল কারও বাড়ির ‘পেছনের উঠান’ হয়ে থাকা মেনে নেবে না।

টিবিআই/আরআর

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন