জাকিয়া জিতু
প্রকাশ: ০১:৪০, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: টিবিআই
বর্তমান সময়ে দাম্পত্য জীবন কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন প্রায়ই ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়িয়ে জটিল সামাজিক ও আইনি সংকটে রূপ নেয়। আবেগ, অধিকার, সম্পত্তি, সন্তান এবং পারিবারিক দায়িত্ব—সবকিছু মিলিয়ে একটি ব্যক্তিগত বিরোধ কখনো কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে বিষয়টি আর শুধু পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
কিন্তু মানবসভ্যতার শুরুর দিকে পারিবারিক সম্পর্কের কাঠামো ছিল ভিন্ন। প্রাগৈতিহাসিক যুগের Hunter-Gatherer সমাজে মানুষ ছোট ছোট যাযাবর গোষ্ঠীতে বসবাস করত। সেখানে ব্যক্তির চেয়ে পুরো গোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও টিকে থাকাই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রক্তের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও, গোষ্ঠীর সম্মিলিত স্বার্থই ছিল বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত।
সভ্যতা এগিয়েছে, মানুষ স্থায়ী বসতি গড়েছে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা তৈরি হয়েছে। আর সেই সঙ্গে পরিবার, বিবাহ, উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির অধিকারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা ধরনের সামাজিক ও আইনি কাঠামো।
Industrial Revolution মানুষের জীবনযাত্রা ও সামাজিক কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। বিশেষ করে Britain, ইউরোপ এবং পরে United States-এ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং ব্যক্তির আইনি অধিকারের ধারণাও শক্তিশালী হতে থাকে।
ফলে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, সম্পত্তি, উত্তরাধিকার এবং পারিবারিক দায়িত্বের মতো বিষয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন হয় আরও সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর। বিভিন্ন দেশে গড়ে উঠতে থাকে Personal Law ও Family Law-এর পৃথক চর্চা।
তবে এই আইনগুলোর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, নারী ও পুরুষের আইনি অবস্থান সব সময় সমান ছিল না।
প্রাচীন Roman Society-তে পরিবারের প্রধান ছিলেন Pater familias। পরিবারের ওপর তার ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। পরিবারের সদস্যদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা থেকে শুরু করে নবজাতককে পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া বা প্রত্যাখ্যান করার মতো ক্ষমতাও তার হাতে ছিল।
বিয়ের ক্ষেত্রেও নারীর অবস্থান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক নারী বিয়ের পর স্বামীর পরিবারের অধীনে চলে যেতেন। এই ব্যবস্থাকে বলা হতো cum manu। পরবর্তী সময়ে sine manu বিবাহের প্রচলন বাড়ে, যেখানে নারী তার পিতৃপরিবারের সঙ্গে আইনি সম্পর্ক ও সম্পত্তির অধিকার অনেকাংশে ধরে রাখতে পারতেন।
Roman Law-এ যৌতুক বা dos-এরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নারী বা তার পরিবারের যৌতুক ফেরত পাওয়ার আইনি অধিকার ছিল।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, Roman Law-এ বিবাহবিচ্ছেদ তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রী—উভয়েই বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারতেন এবং এর জন্য আধুনিক অর্থে কোনো জটিল বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতো না।
France-এর Ancien Régime-এ পারিবারিক আইন ছিল Roman Law, স্থানীয় Customary Law এবং Catholic Church-এর প্রভাবের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি জটিল ব্যবস্থা।
Louis XIV বা ‘Sun King’-এর শাসনামলে রাজতন্ত্রের ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। তার সঙ্গে যুক্ত বিখ্যাত উক্তি—“L'État, c'est moi” বা “আমিই রাষ্ট্র”—পরবর্তী সময়ে তার নিরঙ্কুশ রাজকীয় ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই সময় বিবাহকে মূলত ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হতো। নারীর স্বাধীন আইনি ও সম্পত্তিগত ক্ষমতাও ছিল সীমিত। বিবাহিত নারীর সম্পত্তি ও আর্থিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বামী ও পরিবারের নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রবল।
পরবর্তীকালে Louis XVI-এর সময়ও বিবাহকে একটি পবিত্র ও প্রায় অবিচ্ছেদ্য ধর্মীয় বন্ধন হিসেবে বিবেচনা করা হতো। Divorce-এর সুযোগ ছিল না বললেই চলে। তবে গুরুতর দাম্পত্য বিরোধের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকার জন্য Separation de corps-এর আইনি ব্যবস্থা ছিল।
Queen Victoria-এর শাসনামলের Britain-এ নারীর বৈবাহিক আইনি অবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল Coverture doctrine।
এই ধারণার অধীনে বিবাহের পর একজন বিবাহিত নারীর পৃথক আইনি সত্তা কার্যত স্বামীর আইনি সত্তার মধ্যে বিলীন হয়ে যেত। ফলে তার সম্পত্তি, উপার্জন এবং অন্যান্য আর্থিক অধিকারের ওপর স্বামীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতো।
বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও ছিল স্পষ্ট বৈষম্য। একজন পুরুষ স্ত্রীর adultery বা ব্যভিচার প্রমাণের ভিত্তিতে divorce চাইতে পারতেন। কিন্তু একজন নারীকে divorce পেতে হলে adultery-এর পাশাপাশি আরও গুরুতর কিছু কারণ—যেমন cruelty বা অন্যান্য নির্দিষ্ট পরিস্থিতি—প্রমাণ করার প্রয়োজন হতো।
অর্থাৎ, আইন শুধু পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করেনি; একই সঙ্গে নির্ধারণ করেছে পরিবারে নারী ও পুরুষের ক্ষমতার অবস্থানও।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পারিবারিক আইন পরিবর্তনের যে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার প্রভাব ভারতীয় উপমহাদেশেও পড়ে। তবে এখানে আইন ও সামাজিক পরিবর্তনের পথটি ছিল আরও জটিল। ধর্মীয় বিধান, প্রচলিত সামাজিক রীতি, ঔপনিবেশিক প্রশাসন এবং সংস্কার আন্দোলন—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে পারিবারিক আইনের বর্তমান কাঠামো।
১৮২৯ সালে সতি-প্রথা বিলোপ ছিল নারীর সুরক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত পদক্ষেপ। পরবর্তী সময়ে Widow Remarriage, Child Marriage এবং নারীর সম্পত্তির অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা হয়।
তবে আইন প্রণয়ন আর সমাজের বাস্তব পরিবর্তন—দুটি বিষয় যে এক নয়, ইতিহাস তারও অসংখ্য উদাহরণ দিয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের পারিবারিক আইন ব্যবস্থাতেও সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন পরিবর্তন এসেছে। ১৯৮৫ সালের Family Courts Ordinance পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ আদালতের ব্যবস্থা করে। বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর, ভরণপোষণ, সন্তানের হেফাজতসহ বিভিন্ন পারিবারিক বিরোধ আইনি কাঠামোর মধ্যে নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—আইনের এই কাঠামো বাস্তব জীবনে নারীকে কতটা সমান অধিকার ও সুরক্ষা দিতে পারছে?
কারণ, আইনের অস্তিত্বই সব সময় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, পারিবারিক চাপ, বৈষম্যমূলক প্রথা, আইনি সহায়তা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা—সবকিছু মিলিয়ে একজন নারীর জন্য তার আইনি অধিকার বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
আধুনিক রাষ্ট্রে আইনি সমতার ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলেও পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামাজিক বাস্তবতা এখনও অনেক সময় সেই সমতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে বিবাহবিচ্ছেদ, ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারের মতো বিষয়ে একজন নারীকে শুধু আইনের সঙ্গে নয়, সামাজিক মানসিকতার সঙ্গেও লড়াই করতে হয়।
অর্থাৎ, কয়েক শতাব্দীর আইনগত বিবর্তন আমাদের অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে ঠিকই; কিন্তু প্রশ্নটি এখনও রয়ে গেছে—আইনে যে অধিকার স্বীকৃত, সমাজ কি সেই অধিকার বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করেছে?
নারীর অধিকার নিশ্চিত করার লড়াই তাই কেবল নতুন আইন প্রণয়নের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন, আইনের কার্যকর প্রয়োগ, সহজলভ্য বিচারব্যবস্থা এবং পরিবার সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের ধারণাগুলোর পুনর্মূল্যায়ন।
কারণ, শেষ পর্যন্ত কোনো অধিকার তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা আইনের পাতায় থাকার পাশাপাশি মানুষের জীবনে বাস্তব অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
জাকিয়া জিতু: আইনজীবি ও সংস্কৃতিকর্মী