১৬ আশ্বিন ১৪৩৩, অক্টোবর ২, ২০২৬

পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের 

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩:০০, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের 

প্রতীকী ছবি

দেশের দুই প্রান্তের ভৌগোলিক সীমানাকে এক সুতায় গেঁথে এবার পাহাড় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত পাড়ি দেবে রেলের চাকা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় দেশের সর্ব উত্তরের জেলা হিমালয়ঘেঁষা পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সমুদ্র শহর কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ব্রডগেজ/ডুয়েলগেজ লাইনে ট্রেন চলাচলের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। 

এই পথের দূরত্ব এক হাজার ৭৭ কিলোমিটার, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘতম রেল রুট। পাঁচটি পৃথক প্রকল্পের সমন্বয়ে এই রুট বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে নতুন করে সরাসরি ২০টি আন্তঃনগর ট্রেনসহ প্রায় আড়াইশ ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এই রুট বাস্তবায়নের জন্য পাঁচটি প্রকল্প— টঙ্গী থেকে আখাউড়া, লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী, শান্তাহার থেকে বগুড়া এবং বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ব্রডগেজ ও ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে করা হচ্ছে। এই পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি অগ্রাধিকারে থাকা এই করিডরের আধুনিকায়নে কোনো ধরনের আপস করতে রাজি নয় প্রশাসন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। রেলওয়ে অপারেশন ও পরিবহন দপ্তরের মতে, এই রুট শুধু যাত্রীসেবাই বাড়াবে না, বরং পাহাড় আর সাগরের দূরত্ব ঘুচিয়ে দেশের অর্থনীতিতে নতুন জোয়ার আনবে। এমনকি চলমান আয়ের অর্ধেকের বেশি আয় হবে এই রুট চালুর মাধ্যমে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। 

রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে পরিকল্পনা দপ্তর সূত্রে জানা যায়, পঞ্চগড় ও কক্সবাজারের এই রুট নিশ্চিত হলে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ স্থাপিত হবে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিধি আরও বাড়িয়ে দেবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পর্যটকরা খুব সহজেই পাহাড় ও সমুদ্রের সৌন্দর্য একই যাত্রায় উপভোগ করতে পারবেন, যা দেশের পর্যটন খাতে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দেবে।

এ ছাড়া দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য এবং দক্ষিণাঞ্চল থেকে উৎপাদিত লবণ ও শুঁটকি সরাসরি সারা দেশে সস্তায় ও দ্রুততম সময়ে পরিবহন করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এতে করে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য দ্রুত ও কম খরচে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিতে পারবেন।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিংস্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন বলেন, এ প্রকল্পটি রেলের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রেলের দুটি অঞ্চল এক হয়ে যাচ্ছে। দুই প্রান্তে সরাসরি ট্রেন পরিচালনার জন্য ইঞ্জিন-কোচসহ প্রয়োজনীয় রোলিংস্টক সামগ্রীও ক্রয় করা হচ্ছে।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, পুরো রেলপথ একই ধারায় উন্নতি হচ্ছে। এতে ট্রেনের সংখ্যা বাড়বে। যাত্রী সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে আয়ও বাড়বে।

রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন বলেন, এটি সময়ের দাবি। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকায় আমাদের ওপর দায়িত্বও অনেক। পঞ্চগড় থেকে ঢাকা হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত পুরো রুটে নিরবচ্ছিন্ন ও উচ্চগতির ট্রেন পরিচালনার জন্য আমরা দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছি। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই এই ঐতিহাসিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দারুণ গতিতে ট্রেন চালানো সম্ভব হবে।

রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, পঞ্চগড়সহ পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ এখন থেকে সরাসরি ট্রেনে কক্সবাজার যেতে পারবেন। তিনি বলেন, সাড়ে চার বছরের মধ্যেই এই পথের পাঁচটি প্রকল্প সম্পন্ন করে ট্রেন চালানো সম্ভব হবে এবং এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে যথাযথ ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রেলওয়ের দুটি প্রধান অঞ্চল— পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল একীভূত হয়ে যাবে, যার ফলে যাত্রী, মালামাল ও কনটেইনারবাহী ট্রেন সরাসরি দুই অঞ্চল ধরে চলাচল করতে পারবে।

রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুশাসন অনুযায়ী এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে বর্তমান সরকারের মেয়াদেই। এটি হবে রেল যোগাযোগের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক মেলবন্ধন। আমাদের লক্ষ্য খুব স্পষ্ট-আধুনিক ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পশ্চিম-উত্তরের প্রান্তিক জনপদ থেকে শুরু করে দক্ষিণের সমুদ্রতট পর্যন্ত ট্রেনের গতি ও যাত্রীসেবাকে এমন এক স্তরে নিয়ে যাওয়া, যা আগে কেউ কল্পনাও করেনি। এ রুটটি চালু হলে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ট্রেন ছুটবে, যা দেশের পর্যটন আর অর্থনীতিতে এক নতুন রূপান্তর ঘটাবে।

টিবিআই/আরআর

আরও পড়ুন