১৬ আশ্বিন ১৪৩৩, অক্টোবর ২, ২০২৬

দ্য ইকোনমিস্টের নিবন্ধ

ভারতে অনুপ্রবেশকারী ধরার ফাঁদে সীমান্তের গ্রামগুলো যেন কারাগার

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৩:৫৪, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারতে অনুপ্রবেশকারী ধরার ফাঁদে সীমান্তের গ্রামগুলো যেন কারাগার

ছবি: দ্য ইকোনমিস্ট

ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে ‘অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্ত ও ঠেকানোর নামে কঠোর নজরদারি, তল্লাশি, আটক এবং কথিত ‘পুশব্যাক’ এখন সীমান্তবর্তী মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। 

ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নিরাপত্তার নামে তৈরি হয়েছে অস্থায়ী চেকপয়েন্ট ও বাফার জোন; সেখানে চলাচল, পণ্য পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পড়ছে। 

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট-এর এক প্রতিবেদনে সীমান্তের এমন বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ধরার এই অভিযানে শুধু বাংলাদেশি নাগরিকরাই নয়, ভারতীয় সীমান্তবাসীরাও নানা ধরনের হয়রানি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছেন।

একটি অস্থায়ী চেকপয়েন্ট। সেখানেই আটকে যাচ্ছে গাড়ি থেকে শুরু করে যেকোনো মানুষ। চেকপয়েন্টটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হাকিমপুরের একটি গ্রামের সড়কে। সেখানে দুই তরুণী বোরকা পরে অপেক্ষা করছেন। এক সীমান্তরক্ষী তাদের ব্যাগগুলো তন্নতন্ন করে দেখছে। তাদের পেছনে প্রায় এক কিলোমিটার প্রশস্ত একটি অস্বস্তিকর বাফার জোন। এটি এখনো ভারতীয় ভূখণ্ডের ভেতরেই, তবে এখানে মানুষের স্বাভাবিক স্বাধীনতা নেই। তবে অনেক সীমান্তবর্তী এলাকার মতো এটি নো-ম্যানস-ল্যান্ড নয়। এই বাফার জোনে থাকা সাতটি গ্রামে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ বসবাস করে।

সীমান্তে বাড়তে থাকা বিধি-নিষেধ ও তল্লাশি নিয়ে জানতে গেলে অভিযোগ জানানোর লোকদের ভিড় জমে যায় দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিনিধিদের কাছে।

এই বাফার জোনটি মূলত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ থেকে আসা তথাকথিত ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ ঠেকানোর জন্য। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ভাষ্য, এসব মানুষ ভারতের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জনমিতিক ভারসাম্যের জন্য হুমকি। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তথাকথিত ‘প্রত্যেক বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে উল্টো করে ঝুলিয়ে দেবেন’ এবং তাদের ‘উইপোকার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।

নিঃসন্দেহে ভারতে বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই বসবাসকারী বিদেশির সংখ্যা অনেক, সম্ভবত কয়েক মিলিয়ন। তাদের কিছু আবার বাংলাদেশিও। কিন্তু ভারত সরকার দুই কোটি পর্যন্ত এমন মানুষের চাঞ্চল্যকর হিসাব উল্লেখ করেছে এবং শপথ করে বলছে, তাদের সবাইকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে। সম্প্রতি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে অমিত শাহ বলেছেন, ভারত কোনো ‘ধর্মশালা’ বা দাতব্য অতিথিশালা নয়।

এ বিবেচনায় তিনি ঠিকই বলেছেন— ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকা এখন অনেকটা খোলা আকাশের নিচে পরিচালিত এক বিশাল কারাগারের মতো। সীমান্তে কাটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের বিচার–বিশ্লেষণ এবং বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা না দিয়েছে যেখানে কাটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব নয় সেখানে, নদীপথে সীমান্ত পাহারা দেওয়ার জন্য সাপ ও কুমির ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছিল ভারতের পক্ষ থেকে। 

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে প্রায় ৩৬ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশিরা তো নিহত হচ্ছেনই, কিন্তু সীমান্তের উত্তেজনাপূর্ণ রাজনীতির ফাঁদে ভারতীয়রাও আটকা পড়েছেন।

ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার চার হাজার ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত বিশ্বের দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি এবং সবচেয়ে অরক্ষিত সীমান্তগুলোরও একটি। ঔপনিবেশিক ইতিহাস কয়েক কোটি বাঙালিকে আলাদা আলাদা দেশে ভাগ করে দিয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক মানুষ সীমান্তের এপার-ওপার যাতায়াত করেন। কিছু বাড়ির রান্নাঘর ভারতে, আর শোবার ঘর বাংলাদেশে।

দোকানদার টনি সরদার তার ফোনে এমন এক নৌকাবাইচের ভিডিও দেখান, যেখানে নদীর যে অংশটি অনায়াসে সাঁতরে পার হওয়া যায়, তার ওপারে থাকা বাংলাদেশিরা ভারতীয় মাঝিদের উৎসাহ দিচ্ছেন। চলতি বসন্তে সেই নৌকাবাইচ বন্ধ হয়ে গেছে। 

২০১৪ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জাতীয়ভাবে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সীমান্তনীতি আরও কঠোর হয়েছে। কিন্তু এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় নিয়মকানুন ও রাজনৈতিক বক্তব্য আরও কদর্য হয়ে ওঠে।

রাজ্যে প্রথমবারের মতো জয়ী হয়ে বিজেপি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পাঁচটি ভারতীয় রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড়টির—পশ্চিমবঙ্গের নিয়ন্ত্রণ নেয়। আগস্টে অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে নতুন একটি করে গোয়েন্দা ইউনিট মোতায়েন করা হবে। যাদের কাজ হবে উগ্রপন্থী ও চোরাকারবারিদের ওপর নজর রাখা। বিজেপি নির্বাচনী প্রচারণায় তথাকথিত ‘বাংলাদেশিদের’ ‘পুশব্যাক’ নিয়েও প্রচার চালিয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাভাষী মুসলিমদের— যারা ভারতীয় নন বরং বাংলাদেশি বলে অভিযোগ করা হয়, ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয় কোনো ধরনের যোগাযোগ বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই। এই তাৎক্ষণিকভাবে বানানো পদ্ধতিতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া উপেক্ষা করা হয়।

সমালোচনা হলেও, তাতে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দমে যাননি। তিনি পুলিশকে আটক ব্যক্তিদের সরাসরি সীমান্তরক্ষীদের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। জুনের শেষ নাগাদ তিনি তার আমলে ১০ হাজার ‘পুশব্যাক’ হয়েছে বলে গর্ব করে জানান। পর্যবেক্ষকদের মতে, সংখ্যাটি প্রায় পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার। 

এখন বাংলাদেশও নিজ সীমান্তে টহল জোরদার করায় তাদের অধিকাংশকে আটককেন্দ্র অথবা বাফার জোনে পাঠানো হচ্ছে। যাদের নির্বাসিত করা হচ্ছে, তাদের প্রায় সবাই মুসলিম। শুধু বাংলা ভাষায় কথা বলা এবং মক্কার দিকে মুখ করে নামাজ পড়ার কারণে তাদের বিদেশি বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। 

তাদের কয়েকজনকে ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়ার— স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) পর আটক করা হয়। সেই প্রক্রিয়ায় বহু বাসিন্দাকে ভোট দেওয়ার অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, ফলে তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়, যদিও তারা নিজেদের নাগরিকত্বের পক্ষে উপস্থাপন করার মতো নথিপত্র দেখাতে পারেন।

একই সময়ে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তারা কাগজপত্রহীন হিন্দুদের সীমান্তরক্ষীদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে দেখেছেন। সেইসব হিন্দুদে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে— হিন্দুরা থেকে যেতে পারবেন। কারণ, বাংলাদেশে হিন্দুরা কথিতভাবে ‘ক্রমবর্ধমান হামলার শিকার’ হচ্ছে। ২০২৪ সাল থেকে এই দ্বৈত মানদণ্ড আইনে পরিণত হয়েছে— প্রতিবেশী দেশগুলোর অমুসলিম সংখ্যালঘুরা আশ্রয়ের আবেদন করতে পারবেন এবং দ্রুত নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়ায় যেতে পারবেন।

সীমান্তে দৈনন্দিন জীবন এখন একঘেয়ে, ক্লান্তিকর ও ভীতিজনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায়ই সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে চার-পাঁচ ঘণ্টা সময় নষ্ট করেন। তারা মোটরবাইক খুলে খুলে পরীক্ষা করে এবং খাবারের বাক্সে লাঠি বা আঙুল ঢুকিয়ে তল্লাশি চালায়। শীতের কুয়াশায় কর্মকর্তারা সবসময় চেকপয়েন্টে দায়িত্ব পালনের মেজাজে থাকেন না। ফলে স্থানীয়রা সীমান্তের এপার-ওপার আটকে পড়েন। চোরাকারবারি চক্রকে ঠেকাতে যে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, সেটিও গ্রামবাসীদের খাবার, শিশুর ফর্মুলা দুধ এবং স্যানিটারি প্যাড থেকে বঞ্চিত করছে।

সীমান্তবর্তী একটি গ্রামের প্রধান আকমল গাজী বলেন, ‘আমরা কি আসলেই ভারতের অংশ?’

ভারতের রাজনীতি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও তিক্ত করে তুলেছে। এই সম্পর্ক অবশ্যই এমনিতেই আগে থেকেই অত্যন্ত নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। 

দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ বলেন, ভারতের উচিত প্রতিবেশী বাংলাদেশকে কিছুটা ‘ইজ্জত’ অর্থাৎ, সম্মান দেখানো। কিন্তু বিজেপির ‘উইপোকা’ এবং ‘অনুপ্রবেশকারী’র মতো শব্দের ব্যবহার দেখে মনে হয়, তাদের অভিধানে সম্মানের জন্য খুব বেশি জায়গাই রাখা হয়নি। 

টিবিআই/আরআর

আরও পড়ুন