টিবিআই ডেস্ক
প্রকাশ: ০২:১৯, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হরমুজে যুদ্ধ মানে শুধু তেলের দাম বাড়া নয় । ছবি: টিবিআই
হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধ শুরু হলে পৃথিবীর মানুষ প্রথমে তেলের দামের দিকে তাকায়। ব্যারেলপ্রতি তেল কত ডলারে উঠল, পেট্রল-ডিজেলের দাম কত বাড়বে, বাজারে জ্বালানি সরবরাহ কমবে কি না—এসব প্রশ্নই সামনে আসে।
কিন্তু হরমুজের বর্তমান সংকট আসলে তেলের চেয়ে অনেক বড়।
এটি জ্বালানি সংকট। একই সঙ্গে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, পরিবেশ, পানি, খাদ্য, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সংকট।
সবচেয়ে বড় কথা, এর অভিঘাত পারস্য উপসাগরের তীরে থেমে থাকবে না। ঢাকাতেও তার ঢেউ পৌঁছাবে।
৯ সেপ্টেম্বর আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অপেক্ষায় ছিল ৪২টি তেলবাহী ট্যাংকার। এর মধ্যে ১৮টি তেল বহন করছিল। এসব জাহাজের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা প্রায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার ঘনমিটার তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য। তবে এগুলোতে ঠিক কত পরিমাণ তেল ছিল, তা নিশ্চিত নয়।
সমস্যা এখানেই।
যুদ্ধের মধ্যে একটি ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করলে শুধু একটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আগুন লাগতে পারে, জাহাজ ডুবে যেতে পারে, বিপুল পরিমাণ তেল সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
হরমুজের ভূগোল এ ঝুঁকিকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। পারস্য উপসাগর অগভীর ও আধা-বদ্ধ জলভাগ। ভারত মহাসাগরের সঙ্গে এর পানির বিনিময়ও সীমিত। ফলে বড় ধরনের তেল দূষণ হলে তা দ্রুত সাগরের বিশাল পরিসরে ছড়িয়ে গিয়ে হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ কম।
প্রবালপ্রাচীর, সামুদ্রিক ঘাস, ম্যানগ্রোভ, মাছের প্রজননক্ষেত্র, কচ্ছপ ও সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
হরমুজ সংকটের সবচেয়ে কম আলোচিত দিকটি সম্ভবত পানি।
উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষের পানির প্রধান উৎস সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করে তৈরি করা পানি। ফলে সমুদ্র দূষিত হলে বিষয়টি শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় থাকে না; তা জনস্বাস্থ্য ও নগরজীবনের সংকটেও পরিণত হতে পারে।
তেল সমুদ্রের পানির ওপর ভেসে থাকলে উপকূলীয় পানি সংগ্রহকেন্দ্রের কাঁচা পানির মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গুরুতর পরিস্থিতিতে লবণমুক্তকরণ কেন্দ্রের কার্যক্রম সাময়িকভাবে সীমিত করতেও হতে পারে।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে একটি তেল ছড়িয়ে পড়লেই উপসাগরের কোটি কোটি মানুষ পানিহীন হয়ে যাবে। ঝুঁকিটি নির্ভর করে তেল কোথায় ছড়িয়েছে, স্রোতের গতিপথ কী, পানি সংগ্রহের স্থান কত দূরে এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি কতটা কার্যকর—এসবের ওপর। আধুনিক নজরদারি ও দ্রুত ব্যবস্থা ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে।
কিন্তু যুদ্ধের সময় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাই কমে যায়।
এটি কোনো কাল্পনিক আশঙ্কা নয়।
ওমানের উপকূলের কাছে Caroline Bezengi নামের একটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তেল ছড়াচ্ছে। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, জাহাজটিতে প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল তেল ছিল। ওমানের কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, এই তেল উপকূলের প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকা ও মাসিরাহ দ্বীপের আশপাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে যুদ্ধ শুরুর পর অন্তত ৭৫টি জাহাজ আক্রান্ত এবং অন্তত ২১ জন নাবিক নিহত হয়েছেন বলে আল জাজিরা জানিয়েছে। কয়েকটি ঘটনায় আগুন ও তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে।
অর্থাৎ হরমুজ এখন শুধু একটি যুদ্ধের নৌপথ নয়। এটি সম্ভাব্য পরিবেশগত বিপর্যয়েরও কেন্দ্র।
তেলের দাম ইতিমধ্যেই ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। ৯ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ১০১ ডলারের ওপরে ওঠে। গত এক মাসে দাম বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ।
কিন্তু বাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু সরবরাহ কমে যাওয়া নয়। কত তেল আসলে হরমুজ দিয়ে বের হচ্ছে, সেটি নিয়েও এখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কিছু ট্যাংকার নিরাপত্তার কারণে তাদের অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র বন্ধ করে দিচ্ছে। ফলে কোন জাহাজ কোথায় আছে, কত তেল যাচ্ছে—তার নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম রয়েছে।
বাজারে এই অনিশ্চয়তারও দাম আছে।
তেল সরবরাহ ঠিক থাকলেও যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়লে জাহাজের বিমা খরচ বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, বিকল্প পথে যেতে সময় বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামে যোগ হয়।
হরমুজের সংকটের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অভিঘাত পড়তে পারে এশিয়ায়।
কারণ এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যেই এশিয়ার পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি কমেছে এবং ডিজেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। জাহাজের জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে।
অর্থাৎ সংকটের ধারাটি খুব সরল:
হরমুজে হামলা → জাহাজ চলাচলে বাধা → জ্বালানি সরবরাহে চাপ → পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি → পণ্যের দাম বৃদ্ধি → মূল্যস্ফীতি।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় সংসদে এ বছরের এপ্রিলে দেওয়া তথ্যমতে, দেশের মোট আমদানি করা জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ থেকে ২৩ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। তবে অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে নির্ভরতা অনেক বেশি—বাংলাদেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে যে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তার স্বাভাবিক পথ হরমুজ।
এর অর্থ, হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে বাংলাদেশের প্রথম চাপটি পড়বে জ্বালানি আমদানিতে। এরপর পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয়, কৃষির সেচ—একটির পর একটি খাতে তার প্রভাব পড়তে পারে।
গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ৮৫ শতাংশ বেড়েছিল। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, মূল্যস্ফীতি ও আমদানি ব্যয়—তিনটিই বাড়তে পারে।
অর্থাৎ হরমুজে যে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হচ্ছে, তার শব্দ ঢাকায় শোনা যাবে না। কিন্তু তার অর্থনৈতিক প্রতিধ্বনি শোনা যেতে পারে বাজারে।
হরমুজের সংকট আমাদের একটি কঠিন বাস্তবতা দেখিয়ে দিচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতি যতই আধুনিক হোক, তার বড় একটি অংশ এখনো কয়েকটি সরু সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ, বাব আল-মান্দাব, সুয়েজ—যেকোনো একটি পথ অচল হলে তার অভিঘাত হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশেও পৌঁছে যায়।
তাই হরমুজের যুদ্ধকে শুধু ‘তেলের যুদ্ধ’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
এটি একই সঙ্গে জ্বালানি, পানি, পরিবেশ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের যুদ্ধ।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর সম্ভাবনাটি এখনো ঘটেনি—যদি একাধিক তেলবাহী ট্যাংকারে বড় ধরনের হামলা হয় এবং বিপুল পরিমাণ তেল একসঙ্গে পারস্য উপসাগরে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব শুধু মানুষের প্রাণ বা ডলারের দামে করা যাবে না।
তখন প্রশ্ন হবে—একটি যুদ্ধ একটি সাগরকে কতটা বদলে দিতে পারে?
হরমুজের সংকট সেই প্রশ্নটিই সামনে নিয়ে এসেছে।
TBI/PP