১৬ আশ্বিন ১৪৩৩, অক্টোবর ২, ২০২৬

ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা

ট্রাম্পের পরিকল্পনায় বাধা চীন ও রাশিয়া

আল জাজিরা

প্রকাশ: ১৪:৩৮, ২১ আগস্ট ২০২৬

ট্রাম্পের পরিকল্পনায় বাধা চীন ও রাশিয়া

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। ছবি: রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস সার্ভিস/এপি

ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করা যেকোনো দেশকে আর্থিকভাবে শাস্তি দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তেহরানের বিরুদ্ধে তিনি ঘোষণা করেছেন ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের ছয় মাসের মাথায় ট্রাম্পের এই হুমকি এসেছে। পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জনে মার্কিন অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহারের এটি তাঁর সর্বশেষ উদ্যোগ। দ্বিতীয় মেয়াদে একের পর এক বাণিজ্যযুদ্ধের পর এবার ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে চাইছেন তিনি।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ দুই বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও রাশিয়ার ওপর ট্রাম্পের প্রভাব সীমিত।

রাশিয়া ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। দেশটি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অনেকটাই বাইরে থেকে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে চীন নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রয়োজন হলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করতে অতীতেও একাধিকবার আগ্রহ দেখিয়েছে।

কাতারে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সরকার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের এই চাপের প্রচেষ্টা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা ‘খুবই কঠিন’ হতে পারে।

তাঁর মতে, ট্রাম্প এমন একতরফা সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে চাইছেন, যার জন্য সাধারণত বহুপক্ষীয় সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—কে সঙ্গে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’

মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান হবে ‘কোনো দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ’।

ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সহায়তা করা দেশগুলোর জন্য ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতির’ হুমকিও দেন তিনি।

ইরানের তেল পাচার, অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা, নগদ অর্থ স্থানান্তর, এক্সচেঞ্জ হাউস, জাহাজের নিবন্ধন এবং বিভিন্ন ফ্রন্ট কোম্পানির মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেন ট্রাম্প।

এসব কর্মকাণ্ড এখনই বন্ধ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এর মধ্যেই ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাত তেহরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে ইরান দীর্ঘদিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর নির্ভরশীল।

ইরানের সামরিক বাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে—এমন অভিযোগের পর আবুধাবি এই সিদ্ধান্ত নেয়।

ব্র্যান্ডাইস ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য অর্থনীতির অধ্যাপক নাদের হাবিবির ধারণা, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ‘জোরালোভাবে উৎসাহিত বা প্রভাবিত’ করেছে।

তাঁর মতে, ইরানের অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদারকেও একইভাবে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে ওয়াশিংটন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ চীন।

চীনকে চাপে ফেলা কঠিন

চীন-ইরান বাণিজ্য বন্ধ বা সীমিত করার যেকোনো মার্কিন উদ্যোগ বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে।

বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সমুদ্রপথে রপ্তানি করা ইরানের তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ কিনেছে চীন।

কিন্তু চীনের তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ নয়। দেশটির অধিকাংশ শোধনাগার স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয় এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তাদের নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে কম।

ইরানের অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত বড় চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি। এমন পদক্ষেপ চীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে এটি বেইজিংকে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার দিকেও ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল।

থিঙ্কট্যাংক চ্যাথাম হাউসের চায়না, এশিয়া-প্যাসিফিক কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ গবেষক ইউ জিয়ে বলেন, ইরানের অর্থনৈতিক অংশীদারদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের হুমকি চীনের সঙ্গে তেহরানের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক বদলাবে না।

তাঁর মতে, ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয় পক্ষই বর্তমানে সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চাইছে। ফলে ইরান ইস্যুতে নতুন করে সংঘাত বাড়ানোর বদলে দুই দেশ আপাতত একটি ‘সাময়িক যুদ্ধবিরতি’ বজায় রাখতে আগ্রহী।

পল মাসগ্রেভ বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যদি আগ্রাসী ধরনের ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ আরোপ করে, তার প্রভাব হবে বড়। তবে ট্রাম্প সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ককে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাইবেন না।

কারণ, তাঁর ভাষায়, দুই দেশ বর্তমানে এক ধরনের ‘অর্থনৈতিক শীতল যুদ্ধের’ মধ্যে রয়েছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ানও ট্রাম্পের অর্থনৈতিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, আরও নিষেধাজ্ঞা সমস্যার সমাধানে সহায়তা করবে না।

চীন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়া এবং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উপায়ে সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।

আগামী মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। তার আগে যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।

চলতি বছরের শেষ দিকে দুই দেশের নেতাদের মধ্যে আরও দুটি সম্ভাব্য বৈঠক হতে পারে। ইউ জিয়ের মতে, এসব বৈঠকে উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত অবশ্যই আলোচনার একটি বিষয় হবে। তবে এটি দুই দেশের আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে না।

রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক

চীনের তুলনায় ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছোট। তবে ওয়াশিংটনের জন্য মস্কো আরও ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

বছরের পর বছর ধরে রাশিয়া ও ইরান পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ব্যাপক মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দুই দেশ ২০ বছরের একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে।

রাশিয়ার জ্বালানিমন্ত্রী সের্গেই সিভিলেভের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ৪৮০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেলের পাশাপাশি ক্যাস্পিয়ান সাগর ব্যবহার করে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিনিময়ের খবরও পাওয়া গেছে।

এনবিসি নিউজ সোমবার একটি ইউরোপীয় সরকারের নথির বরাত দিয়ে জানায়, রাশিয়া সমুদ্রপথে ইরানে ‘ড্রোনের যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ ও টিএনটি’ পাঠিয়েছে।

অর্থাৎ, রাশিয়ার ওপর ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে ইরানকে সহায়তার জন্য মস্কোর বিরুদ্ধে নতুন করে চাপ প্রয়োগের সুযোগও ওয়াশিংটনের সীমিত।

নিষেধাজ্ঞার বাইরে নতুন অর্থনৈতিক পথ খুঁজছে ইরান

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বুধবার ট্রাম্পের অর্থনৈতিক চাপের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

তিনি এটিকে ওয়াশিংটনের ‘ব্যর্থ নীতির’ ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এর ফল হবে ‘আরও একটি পরাজয়’।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাঘচি বলেন, মার্কিন ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বিশ্ব অর্থনীতি ও বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে।

ইরান বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য। চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিলসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিগুলো এই জোটের অংশ।

পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প অর্থায়নের পথ তৈরি করতে ইরান ব্রিকসকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।

গত সপ্তাহে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি বলেন, তাঁর দেশ ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এর ফলে পশ্চিমা বাজারের বাইরে ইরানের জন্য নতুন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো নিজেদের মুদ্রায় পারস্পরিক লেনদেন করতে পারে। একই সঙ্গে ইরান অন্যান্য ব্রিকস সদস্যের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় আর্থিক সহযোগিতার বিষয়ও বিবেচনা করছে।

তবে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এখনো ইরানের সম্ভাব্য সদস্যপদ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। সদস্য হতে হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে তেহরানকে।

‘ট্রাম্প এমন যুদ্ধে আটকে আছেন, যা তিনি জিততে পারবেন না’

তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলী আকবর দারেইনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘শ্বাসরোধকারী’ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান টিকে থাকার পথ খুঁজে নেবে।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প এমন একটি যুদ্ধে আটকে আছেন, যে যুদ্ধ তিনি জিততে পারবেন না এবং যেখান থেকে বেরিয়েও আসতে পারছেন না।’

ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে, তা শুধু ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করছে না। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে তেহরানের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক এবং পশ্চিমা ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরির ইরানের প্রচেষ্টাই ট্রাম্পের পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: Al Jazeera English
মূল প্রতিবেদন: Stephen Quillen
মূল প্রতিবেদন লিংক: https://aje.news/qpbfvp

 

টিবিআই/ প্রীপা

আরও পড়ুন