১৬ আশ্বিন ১৪৩৩, অক্টোবর ২, ২০২৬

চুড়ি শুধু অলঙ্কার নয়—সংস্কৃতিরও প্রতীক

জাকিয়া জিতু

প্রকাশ: ০১:০২, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চুড়ি শুধু অলঙ্কার নয়—সংস্কৃতিরও প্রতীক

চুড়ি শুধু অলঙ্কার নয়—সংস্কৃতিরও প্রতীক । ছবি: টিবিআই

জেন-জি আর মিলেনিয়াল—দুই প্রজন্মের চিন্তার গতি, রুচি, পছন্দ কিংবা স্টাইলের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। পোশাক থেকে গান, প্রযুক্তি থেকে জীবনযাপন—প্রায় সব ক্ষেত্রেই যেন তাদের নিজস্ব পছন্দের ছাপ রয়েছে। কিন্তু কাচের চুড়ির কাছে এসে সেই দূরত্বটা যেন খানিকটা কমে যায়। প্রজন্ম বদলালেও হাতে চুড়ির ঝনঝন শব্দের প্রতি আকর্ষণটা রয়ে গেছে।

ইন্টারেস্টিং নয়?

শুধু অলঙ্কার হিসেবে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতি, সামাজিক রীতি ও নারীর জীবনের নানা অধ্যায়ের সঙ্গেও চুড়ির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সময়ের সঙ্গে বদলেছে এর উপাদান, নকশা ও ব্যবহার; কিন্তু এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব হারায়নি।

চুড়িরও আছে নানা রকম

সাদামাটা, একরঙা যে কাচের চুড়ি আমরা সবচেয়ে বেশি দেখি, সেটি সাধারণভাবে ‘রেশমি চুড়ি’ নামে পরিচিত। রেশমি চুড়িও আবার দুই ধরনের—মসৃণ ও খাঁজকাটা।

একসময় জমিদার ও নবাব পরিবারের নারীদের হাতে রেশমি চুড়ি থাকা ছিল খুবই স্বাভাবিক। এমনকি বাড়ির ভেতরে নারীদের উপস্থিতি টের পাওয়ার অন্যতম শব্দও ছিল কাচের চুড়ির ঝনঝনানি। ফলে বিশেষ নকশা ও কারুকাজের চুড়িরও আলাদা কদর ছিল অভিজাত পরিবারে।

চুড়ির ইতিহাস অবশ্য আরও পুরোনো। বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক খননে খোল, তামা, ব্রোঞ্জ, সোনা ও আকিক পাথরের তৈরি চুড়ি পাওয়া গেছে। পাকিস্তানের মহেঞ্জোদারোতে পাওয়া বিখ্যাত ‘নৃত্যরত বালিকা’র মূর্তিতেও এক হাতে একাধিক চুড়ির উপস্থিতি দেখা যায়। এ থেকে প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে চুড়ি ব্যবহারের প্রচলন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

ভারতের তক্ষশীলায় মৌর্য যুগের বিভিন্ন নকশার চুড়ির সন্ধানও মিলেছে। ভাস্কর্য, প্রাচীন নথি, কাব্য, নাটক ও চিত্রকলায় বিভিন্ন ধরনের চুড়ি, তার ব্যবহার এবং সামাজিক-ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের উল্লেখ পাওয়া যায়।

সমাজ ও অঞ্চলভেদে চুড়ির অর্থও বদলেছে। কোথাও এটি নিছক অলঙ্কার, কোথাও বিবাহিত নারীর পরিচয়ের অংশ, আবার কোথাও ধর্মীয় বা সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এমনকি কিছু অঞ্চলে বিবাহিত নারীর হাতে লোহার চুড়ি পরার রীতিও রয়েছে।

নিরেট থেকে জড়োয়া—চুড়ির কত রূপ!

চুড়িকে গঠনের দিক থেকে নিরেট, প্রসারণশীল এবং স্প্রিং বা কব্জাযুক্ত—এমন কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। তবে নকশা, উপাদান ও ব্যবহারভেদে এর ধরন আরও বিচিত্র।

১. মেটাল ভেলভেট চুড়ি

ধাতব কাঠামোর ওপর নরম ভেলভেটের আস্তরণ—আধুনিক চুড়ির মধ্যে এটি আরামদায়ক ও আকর্ষণীয় একটি ধরন। সাধারণত ২৪, ২৬ ও ২৮ সাইজে এবং বিভিন্ন রঙে পাওয়া যায়।

দৈনন্দিন ব্যবহার থেকে শুরু করে পার্টি বা বিয়ের অনুষ্ঠান—বিভিন্ন উপলক্ষেই এগুলো পরা যায়। বাংলাদেশে সাধারণত ডজন বা সেট হিসেবে বিক্রি হয়।

২. দাদিমা চুড়ি বা দিদুন চুড়ি

নামেই যেন পুরোনো দিনের একটা আবহ আছে। এই ধরনের চুড়িতে পাথরের কাজ ও কাচের ওপর নানা ধরনের নকশা দেখা যায়।

এর মধ্যে ‘রেইনড্রপ’ চুড়িতে কাচের ওপর বৃষ্টির ফোঁটার মতো ছোট ছোট অলংকার বসানো থাকে। এ ধরনের চুড়ির একটি বড় অংশ ভারত থেকে আসে।

৩. কাশ্মীরি চুড়ি

নাম শুনে মনে হতে পারে, এটি বুঝি কাশ্মীরের আলাদা কোনো ঐতিহ্যবাহী চুড়ি। আসলে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়া একটি স্টাইলের নাম ‘কাশ্মীরি চুড়ি’।

প্রচলিত কাচের চুড়ির সঙ্গে ঘুঙুর লাগানো ধাতব চুড়ি একসঙ্গে পরাই এই স্টাইলের মূল বৈশিষ্ট্য। ঘুঙুরযুক্ত ওই ধাতব চুড়িকে বলা হয় ‘কাশ্মীরি ঝুমকা’। কাচের চুড়ি ও কাশ্মীরি ঝুমকার এই সমন্বয়ই এখন ‘কাশ্মীরি চুড়ি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

৪. জড়োয়া চুড়ি

বিশেষ অনুষ্ঠান, বিশেষ করে বিয়েতে জড়োয়া চুড়ির কদর আলাদা। সাধারণত এগুলো তুলনামূলক ভারী ও দামী হয় এবং পাথর, অলংকার ও সূক্ষ্ম কারুকাজে সমৃদ্ধ থাকে।

কনের হাতে জড়োয়া চুড়ি শুধু সাজের অংশ নয়, অনেকের কাছে এটি আভিজাত্য ও ঐতিহ্যেরও প্রকাশ।

নামেও আছে মজার গল্প

চুড়ির দুনিয়ায় নামেরও কম বৈচিত্র্য নেই।

তামান্না চুড়িতে কাচের ওপর চুমকি বসানো থাকে। আবার চিকন চুড়ির একটি ধরনকে বলা হয় ‘কেশ চুড়ি’।

নামটা শুনলেই অবশ্য কল্পনা একটু অন্যদিকে চলে যায়—কোনো সুন্দরীর কেশ বুঝি সত্যিই চুরি হয়ে যাচ্ছে!

এদিকে একরঙা চুড়ি ও ‘মাল্টি চুড়ি’র ব্যবহারও বেশ পুরোনো। এসব চুড়ির জনপ্রিয়তার ইতিহাস প্রায় একশ বছরের বলে জানা যায়।

চুড়ি দীর্ঘদিন ভালো রাখবেন যেভাবে

চুড়ি যারা নিয়মিত পরেন এবং বছরের পর বছর ভালো রাখতে চান, তাদের একটু বাড়তি যত্ন নিতে হয়।

ব্যবহারের পর নরম সুতি কাপড় দিয়ে চুড়ি মুছে বাতাসে শুকিয়ে আলাদা বাক্সে রাখা ভালো। মেটাল বা গোল্ডের চুড়ি পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে হালকা গরম সাবান পানি ব্যবহার করা যেতে পারে; পরে অবশ্যই নরম কাপড় দিয়ে ভালোভাবে মুছে শুকিয়ে নিতে হবে।

কাচের চুড়ি একটির সঙ্গে আরেকটি ঘষা খেলে সহজেই আঁচড় পড়তে বা ভেঙে যেতে পারে। তাই এগুলো আলাদা করে এবং আর্দ্রতা থেকে দূরে শুকনো জায়গায় রাখা উচিত।

পাথর বা ধাতব চুড়িও একসঙ্গে রাখলে ঘষা লেগে স্ক্র্যাচ পড়তে পারে। ভেলভেট-লাইনিং দেওয়া বাক্স কিংবা আলাদা আলাদা খোপে রাখলে এগুলো দীর্ঘদিন ভালো থাকে।

ঐতিহ্য থেকে ট্রেন্ডে

চুড়ির গল্প কিন্তু কেবল অতীতের নয়। দেশীয় বিভিন্ন ডিজাইনার হাউজে এখন হাতে আঁকা এক্রেলিক চুড়ি, কাস্টমাইজড কুন্দন, রেশমি সুতোর তৈরি চুড়িসহ নানা ধরনের নতুন নকশা দেখা যাচ্ছে।

সোনা, রূপা, কাচ, কাঠ, সিল্ক সুতো কিংবা বিভিন্ন ধরনের ধাতু—উপকরণ বদলেছে, বদলেছে নকশাও। কিন্তু হাতে পরা চুড়ির সেই চিরচেনা ঝনঝন শব্দটি এখনো হারিয়ে যায়নি।

সম্ভবত এ কারণেই চুড়ি শুধু একটি অলঙ্কার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্মৃতি, উৎসব, সম্পর্ক, আঞ্চলিকতা এবং সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাস।

প্রজন্ম বদলাবে, ফ্যাশন বদলাবে, চুড়ির নকশাও বদলাবে। কিন্তু হাতে কয়েকটি কাচের চুড়ি পরার পর যে শব্দটি ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে—তার আবেদন বোধহয় এত সহজে পুরোনো হওয়ার নয়।

 

জাকিয়া জিতু: আইনজীবি ও সংস্কৃতিকর্মী

 

TBI/PP

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন