নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০০:২৭, ১৫ আগস্ট ২০২৬
উপরে ডান থেকে আমান উল্লাহ আমান, মনজুরুল রিয়াদ, মমিনুল ইসলাম জিসান ও ইব্রাহিম খলিল; নিচে বাঁ থেকে রাজু আহমেদ, গণেশ চন্দ্র রায়, নাহিদুজ্জামান ও আবিদুল
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। দুই বছর মেয়াদি বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা ছোট করে আনা হয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের যাচাই-বাছাই শেষে যেকোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এবার ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি তত্ত্বাবধান করছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্রদলের বিদায়ী সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীনসহ সংগঠনের শীর্ষ নেতারা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে তাঁদের মতামতও নেওয়া হয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেককেই তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে চেনেন। এ কারণে অতীতের মতো বিএনপির বিভিন্ন পক্ষ বা সাবেক নেতাদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কোনো ‘সিন্ডিকেট’ নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পাচ্ছে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতাও নেতৃত্ব বাছাইয়ে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকটি ছিল বিদায়ী নেতৃত্বের সঙ্গে তারেক রহমানের একটি সৌজন্য সাক্ষাৎও। তবে সেখানে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বর্তমান ছাত্রদল নেতাদের কাছে পরবর্তী কমিটিতে আসতে পারেন—এমন কয়েকজনের নামও জানতে চেয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান। এসব নামসহ সম্ভাব্য প্রার্থীদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড যাচাই করে চূড়ান্ত তালিকা করা হচ্ছে।
সূত্রের দাবি, প্রথম ধাপে পাঁচ সদস্যের নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করা হতে পারে।
নতুন কমিটির শীর্ষ পদে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অন্তত ১৫ জন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নেতাদের মধ্যে রয়েছেন সহসভাপতি এ বি এম ইজাজুল কবির (রুয়েল), মনজুরুল আলম (রিয়াদ), সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম (জিসান), ইব্রাহিম খলিল ও রাজু আহমেদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার (অনিক), জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন (শাওন) এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খানের নামও আলোচনায় রয়েছে।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি খোরশেদ আলম (সোহেল), এইচ এম আবু জাফর, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম (তারিক), আবদুর রহিম (রনি), ফারুক আহমেদ, শরীফ প্রধান (শুভ), মো. সোহেল রানা এবং সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ (প্রিন্স) নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ছাত্রদলের শীর্ষ পর্যায়ের দুজন নেতা জানান, নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আন্দোলনে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, শিক্ষাজীবন ও অতীত কর্মকাণ্ড যাচাই করা হয়েছে।
এ ছাড়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা, সারা দেশে সাংগঠনিক যোগাযোগ এবং নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ভালোভাবে কথা বলার সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্দোলন–সংগ্রামে কার কী ভূমিকা ছিল, সেটিও এবার গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়। দীর্ঘ প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংগঠনের সঙ্গে কারা ছিলেন, কারা মামলা, গ্রেপ্তার ও বিভিন্ন চাপের মধ্যেও সক্রিয় ছিলেন এবং জুলাই–আগস্টের আন্দোলনে কার ভূমিকা কেমন ছিল—এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি দেখা হচ্ছে শিক্ষাজীবন, একাডেমিক ফলাফল, পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিচয়, সাংগঠনিক আচরণ এবং কোনো বিতর্ক বা অভিযোগ রয়েছে কি না।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন বলেন, দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সম্মুখসারিতে থাকা এবং অবদান রাখা নেতারা নতুন কমিটিতে এগিয়ে থাকবেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য অতীতে কারা কাজ করেছেন এবং ভবিষ্যতে কাজ করার সক্ষমতা কার রয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
ছাত্রদলের কমিটি গঠনে অতীতে বিভিন্ন পক্ষ ও সাবেক নেতাদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। অনেক সময় ‘সিন্ডিকেট’ তৈরি করে নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের কথাও আলোচনায় এসেছে।
তবে এবার এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সাবেক নেতা, আঞ্চলিক গোষ্ঠী কিংবা ‘সিন্ডিকেটের’ নাম প্রকাশ্যে আসেনি। বরং সম্ভাব্য নেতাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অতীত যাচাইয়ের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সম্ভাব্য নেতাদের বিষয়ে তারেক রহমান নিজেই খোঁজখবর নিচ্ছেন। ছাত্রদলের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত এবং বিভিন্ন আন্দোলন–সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতাদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সব সময় মনোনয়নের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়নি। ১৯৯২ সালে কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে রুহুল কবির রিজভী সভাপতি এবং এম ইলিয়াস আলী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এর ২৭ বছর পর ২০১৯ সালে আবার সরাসরি ভোট হয়। ওই নির্বাচনে ১১৭টি সাংগঠনিক শাখার ৫৩৪ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ৪৮১ জন ভোট দেন। ভোটে ফজলুর রহমান খোকন সভাপতি এবং ইকবাল হোসেন শ্যামল সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
তবে ২০১৯ সালের নির্বাচনেও অঞ্চলভিত্তিক প্রভাব এবং সাবেক ছাত্রদল ও বিএনপি নেতাদের তৎপরতা নিয়ে আলোচনা ছিল। এবার এখন পর্যন্ত সরাসরি ভোট বা কাউন্সিল আয়োজনের কোনো প্রস্তুতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলামকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীনকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের সাত সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটিতে আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহিয়াকে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, শ্যামল মালুমকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং আমানউল্লাহ আমানকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছিল।
ছাত্রদলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুই বছর। সে হিসাবে রাকিবুল–নাছির কমিটির মেয়াদ গত ১ মার্চ শেষ হয়েছে। এরপর প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিই দায়িত্ব পালন করছে।
কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নিয়েও আলোচনা চলছে। দেশের ছাত্ররাজনীতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে এই শাখার নেতৃত্বকে কেন্দ্রীয় রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে আলোচনায় রয়েছেন সাংগঠনিক সম্পাদক নূর আলম ভূঁইয়া (ইমন), বিজয় একাত্তর হল শাখার আহ্বায়ক তানভীর আল হাদী (মায়েদ), কবি জসীমউদ্দীন হল শাখার আহ্বায়ক শেখ তানভীর বারী (হামিম), যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বজলুর রহমান (বিজয়), বি এম কাউসার ও মো. আল আমীন।
এ ছাড়া সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক আবু হায়াৎ মো. জুলফিকার জিসান, প্রচার সম্পাদক তানভীর হাসান, আন্তর্জাতিক সম্পাদক মেহেদী হাসান এবং আপ্যায়ন সম্পাদক আরিফুল ইসলামের নামও আলোচনায় রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক বাস্তবতাও নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
টিবিআই/ প্রীপা