১৭ কার্তিক ১৪৩৩, নভেম্বর ২, ২০২৬

ফুটপাতের মুখরোচক খাবারে উপেক্ষিত জনস্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৩:০১, ১১ অক্টোবর ২০২৬

ফুটপাতের মুখরোচক খাবারে উপেক্ষিত জনস্বাস্থ্য

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতজুড়ে মুখরোচক খাবারের রমরমা ব্যবসা চলছে। তুলনামূলক কম দামে বার্গার, পিঠাসহ নানা ধরনের খাবার পাওয়া যাওয়ায় এসব দোকানে প্রতিদিন ভিড় করছেন ক্রেতারা। তবে খাবারের স্বাদ ও সুলভ মূল্যের আড়ালে উপেক্ষিত থাকছে পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি।

দোকানগুলোর আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকছে খাবারের উচ্ছিষ্ট ও অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা। কোথাও আবর্জনার স্তূপের পাশেই বসে খাবার খাচ্ছেন ক্রেতারা, আবার দুর্গন্ধ এড়িয়ে নাক চেপে চলাচল করছেন পথচারীরা। 

বিক্রেতাদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা না থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে; অন্যদিকে ক্রেতাদের অনেকে দায়ী করছেন দোকানিদের অসচেতনতাকে। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা পরিবেশে বিক্রি হওয়া এসব খাবার ধুলাবালি, রোগজীবাণু, অনিরাপদ পানি ও নিম্নমানের উপকরণের কারণে নানা রোগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) জানিয়েছে, বিভিন্ন ওয়ার্ডে বর্জ্য রাখার ব্যবস্থা ও বিন স্থাপন করা হয়েছে; প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বিন স্থাপন করা হবে। তবে নগরীর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগের পাশাপাশি বিক্রেতা, ক্রেতা ও নগরবাসীর দায়িত্বশীল আচরণও জরুরি। 

প্রশ্ন হচ্ছে, ফুটপাতের এই জমজমাট খাবারের ব্যবসায় পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত হবে কীভাবে, আর প্রতিদিনের আবর্জনা সরানোর দায়িত্বই বা নেবে কে?

সরেজমিন রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিকাল হলেই রাস্তার দুপাশের ফুটপাতে বসে হরেক রকমের খাবারের দোকান। এসব দোকানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা আসেন। নামিদামি রেস্টুরেন্টে পাওয়া যায় এমন অনেক খাবারই এখানে তুলনামূলক কম দামে মেলে।

তবে এসব খাবারের বিক্রির পরিবেশ নিয়ে রয়েছে অভিযোগ। ময়লা-আবর্জনার মধ্যে বসেই খাবার খেতে হচ্ছে ক্রেতাদের। তারা বলছেন, ফুটপাতে দোকান বসানো অবৈধ হলেও এসব দোকানে কম দামে রেস্টুরেন্টের খাবারের স্বাদ পাওয়া যায়। পরিবেশটা ভালো হলে স্বাচ্ছন্দ্যে খাওয়া যেত। বন্ধুদের নিয়ে খেতে এলে নোংরা পরিবেশের কারণে বিব্রতও হতে হয়।

ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে মিনা বাজারের বিপরীত পাশের ফুটপাতে বন্ধুদের নিয়ে বার্গার খাচ্ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। তাদের একজন ইউল্যাবের শিক্ষার্থী আফসানা মিমি। তিনি বলেন, ‘বন্ধুবান্ধব নিয়ে এই এলাকায় প্রায়ই খেতে আসা হয়। খাবারের মানের প্রশ্নে না গেলেও পরিবেশ যে বিচ্ছিরি, তা চারপাশে তাকালেই বোঝা যায়। এর কারণ আশপাশে কোনও ডাস্টবিন নেই। মোড়ে মোড়ে ছোট ছোট বিন স্থাপন করা গেলে ময়লা-আবর্জনা এমন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতো না।’

পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে ফুটপাতে বসে খাবারের অপেক্ষা করছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইমুন। তিনি বলেন, ‘আশপাশের পরিবেশের দিকে না তাকিয়ে আমরা শুধু খেয়ে চলে যাই। পরিবেশের দিকে তাকালে আর খাওয়ার রুচি হবে না।’

এ জন্য দোকানদারদের দায়ী করে তিনি বলেন, দোকানদাররা ব্যবসা শেষে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে রেখে যান। তারা নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা রাখলে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের তা নিতে সুবিধা হতো। এখন একশত দোকানদার একশত জায়গায় ময়লা ফেলেন। ফলে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা ময়লা নেওয়ার পরও অনেক জায়গায় আবর্জনা পড়ে থাকে। এ জন্য ডাস্টবিনের প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে বিক্রেতাদের দাবি, ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় পরিস্থিতি এমন হচ্ছে। ফাস্টফুড বিক্রেতা সাইদুর রহমান বলেন, খাবারের উচ্ছিষ্ট ও রান্নার পর বের হওয়া বর্জ্য রাখার জন্য তারা ঝুড়ি ব্যবহার করেন। কিন্তু ক্রেতারাও খাওয়ার পর ময়লা চারপাশে ফেলে যান। আবার বেচাবিক্রি শেষে বিক্রেতারাও ময়লা রেখে চলে যান। কারণ আশপাশে নির্দিষ্ট কোনও ডাস্টবিন নেই।

সাইদুর রহমানের অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের বখশিশ না দিলে তারা ঠিকমতো ময়লা পরিষ্কার করেন না। তার মতে, সড়কের দুপাশে ময়লা ফেলার জন্য বিন স্থাপন করা উচিত। তবে নগরের বাসিন্দা হিসেবে নিজেরও দায়িত্ব আছে বলে স্বীকার করে নিজ উদ্যোগে ১০টি বিন স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

ফুটপাতের এসব খাবারের স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকটিও তুলে ধরেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘খোলা অবস্থায় বিক্রি হওয়া খাবার ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। খোলা খাবারের ওপর বাতাসে ভাসমান ধুলাবালি, রোগজীবাণু ও দূষিত কণিকা জমে খাবারকে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের মাধ্যমে দূষিত করে। বেশির ভাগ ভাজাপোড়া একই তেলে বারবার ডিপ ফ্রাই করা হয়। দীর্ঘ সময় ব্যবহৃত পাম অয়েল বা নিম্নমানের তেল একসময় ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিকে পরিণত হয়। তাছাড়া এসব খাবারে ব্যবহৃত পানি অনেক ক্ষেত্রেই অনিরাপদ। খাবারকে আকর্ষণীয় করতে ব্যবহৃত অনেক রং মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব খাবার খাওয়ার ফলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, জন্ডিস, হেপাটাইটিস, ফুড পয়জনিং এবং যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ হতে পারে। আর দীর্ঘদিন খেতে থাকলে গ্যাস্ট্রিক, আলসার, হজমের সমস্যা, লিভার ও কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি লিভার বিকল হওয়া এবং ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই সুলভ মূল্যে এসব খাবার পাওয়া গেলেও তা বর্জন করাই উত্তম।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, প্রত্যেক ওয়ার্ডে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে অনেক আগেই ময়লা-আবর্জনা রাখার জন্য বড়সড় পাকা ঘর তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকাতেও বিন স্থাপন করা হয়েছে। আরও কোথাও প্রয়োজন হলে সেখানেও বিন স্থাপন করা হবে।

আবদুস সালাম বলেন, ‘আমরা যতই বিন স্থাপন করি, সেখানে যদি ময়লা না ফেলা হয় তাহলে তো শুধু শুধু অকেজো হয়ে পড়ে থাকবে। এমন অনেক জায়গায় আমি লক্ষ করেছি, বিন আছে, তবু মানুষ যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলছে। তাই নগরবাসীর সহযোগিতা ছাড়া এই নগরী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়।’ 

টিবিআই/আরআর

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন