নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩:১৯, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
গত ২০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের ৮৬ শতাংশের বেশি বই ছাপা হয়েছে এবং ৭৪ শতাংশ সরবরাহ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ২১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম দফায় দরপত্র হওয়া মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ ছাপা হলেও সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ। নবম-দশম শ্রেণির বই সরবরাহের অগ্রগতি আরও কম— মাত্র তিন শতাংশের মতো।
এর মধ্যে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য নতুন করে যুক্ত হতে যাওয়া চারটি বইয়ের ছাপার কার্যাদেশও এখনো দেওয়া হয়নি। আগামী ২৫ অক্টোবর, রোববার জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির সভায় বইগুলোর অনুমোদন পাওয়ার পর কার্যাদেশ দেওয়ার কথা রয়েছে।
পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে খালেদা জিয়ার ভূমিকার মতো ঐতিহাসিক বিষয়েও পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সব মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক বই মুদ্রণ ও সরবরাহের পাশাপাশি পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন বাস্তবায়নের কাজও চলছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপা শেষ করে মাঠপর্যায়ে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পৌঁছানোর বিষয়ে আশাবাদী। তবে অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহে বিলম্ব হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়। তাই নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই সব শিক্ষার্থীর হাতে সব পাঠ্যবই পৌঁছানো নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
২০১০ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে নতুন পাঠ্যবই দেওয়া শুরু করে সরকার। তবে কোনো কোনো বছর শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সব শিক্ষার্থীর হাতে সব বই পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরপর দুই শিক্ষাবর্ষে নির্ধারিত সময়ে সব বই বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। চলতি শিক্ষাবর্ষ শুরুর এক মাস সাত দিন পর, গত ৭ ফেব্রুয়ারি শতভাগ পাঠ্যবই সরবরাহ করতে পেরেছিল এনসিটিবি। এর আগের বছর সব বই সরবরাহ করতে প্রায় তিন মাস লেগেছিল।
প্রাথমিকের বই সরবরাহ ৭৪ শতাংশ, মাধ্যমিকের ৪০: এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপা হচ্ছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও বই রয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে ছাপা হচ্ছে ২২ কোটির বেশি বই। প্রাথমিক স্তরের বইয়ের সংখ্যা প্রায় আট কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার। সব মিলিয়ে বই ছাপার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা।
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের ৮৬ শতাংশের বেশি বই ছাপার কাজ শেষ হয়েছে। বাঁধাই, কাটিং ও প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) শেষে সরবরাহ করা হয়েছে ৭৪ শতাংশ বই।
অন্যদিকে প্রথম দফায় দরপত্র হওয়া মাধ্যমিক স্তরের ২০ কোটি ৮৪ লাখের বেশি বইয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ ছাপার কাজ শেষ হয়েছে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত। এর মধ্যে আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে সরবরাহ করা হয়েছে ৪০ শতাংশ বই।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের বলেন, আমাদের লক্ষ্য ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপার কাজ শেষ করে মাঠপর্যায়ে পাঠানো। এখন পর্যন্ত বই ছাপার অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট আমরা। নির্ধারিত সময় অর্থাৎ জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের হাতে সব পাঠ্যবই তুলে দিতে পারব বলে আশা করছি।
চার নতুন বইয়ের অনুমোদন রোববার: ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তন আনছে এনসিটিবি। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা যুক্ত করার বিষয় রয়েছে।
এ ছাড়া নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে যুক্ত করা হচ্ছে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ। পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা-সম্পর্কিত বর্ণনাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এ বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের পাঠ্যবই, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংশোধিত বই এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে প্রস্তুত করা বইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনা তিন ধরনের রূপ পাচ্ছে।
আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির বই দুটি হলো ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’। ষষ্ঠ শ্রেণির বই দুটি হলো ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, রোববার জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সভা ডাকা হয়েছে। ওই সভায় অনুমোদন পেলে এ চারটি বইয়ের ছাপার কার্যাদেশ দেওয়া হবে।
এদিকে গত ১৭ অক্টোবর প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তক ছাপার অগ্রগতি সরেজমিনে দেখতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে একটি ছাপাখানা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার গিয়াস উদ্দিন রিমন।
অন্যদিকে গত ১০ অক্টোবর একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, প্রিন্টার্স নিম্নমানের বই সরবরাহ করলে তা গ্রহণ না করতে শিক্ষকদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, বইয়ের কাগজের মান, বাইন্ডিং ও অন্যান্য নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন ঠিক না থাকলে সেই বই নেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম বই সরবরাহ করলেও তা গ্রহণ না করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ে মস্তিষ্কের বদলে ‘দাঁড়িপাল্লা’, পরিবর্তনের কথা বলছে এনসিটিবি: ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে রাখা হয়েছে দাঁড়িপাল্লার ছবি। এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ায় প্রতীকটি পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
গত বৃহস্পতিবার রাতে বইটির ছাপার কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে চলে যাওয়া বইগুলো সংগ্রহ করে প্রতীক পরিবর্তনের পর আবার শিক্ষার্থীদের কাছে সরবরাহ করার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে বইটির ছাপা, বাঁধাই ও সরবরাহের কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুদ্রণমালিকেরা। ফলে মাঠপর্যায়ে চলে যাওয়া বই সংগ্রহ করে সংশোধন করা হলে বাড়তি খরচ ও সময় লাগবে বলে তাদের বক্তব্য।
এনসিটিবির বই ছাপানোর হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মাধ্যমিকের বিভিন্ন শ্রেণির বই ছাপানোয় ধীরগতি রয়েছে। এর মধ্যে মাঠ থেকে বই তুলে এনে পরিমার্জন করে পুনরায় সেটা শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাতে সময় বেশি লাগতে পারে। এতে নির্দিষ্ট সময়ে বই পৌঁছানো বিঘ্ন ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন অনেকে।
এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, যেসব বই মাঠে চলে গেছে, সেগুলো সংগ্রহ করে প্রতীকটি পরিমার্জন করে আবার শিক্ষার্থীদের কাছে সরবরাহ করা হবে। আপাতত ছাপার কাজ বন্ধ রাখা এবং মাঠে যাওয়া বই সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো ভুল তথ্য না পায়, সেটা আমরা নিশ্চিত করতে চাই।’
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বইয়ের ‘উপাত্ত ও তথ্য’ পাঠে জ্ঞানের পিরামিডের ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। এতে চারটি স্তর রয়েছে। নিচ থেকে সেগুলো হলো উপাত্ত, তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা। প্রতিটি স্তর বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে আলাদা প্রতীক।
উপাত্তের স্তরে রয়েছে পাই চার্ট বা ঘড়ির মতো বৃত্তাকার প্রতীক। তথ্যের স্তরে রয়েছে পরমাণু বা নেটওয়ার্কের মতো দেখতে একটি প্রতীক। জ্ঞানের স্তর বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের ছবি। আর পিরামিডের সর্বোচ্চ স্তর প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে রাখা হয়েছে দাঁড়িপাল্লা।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বইয়ের প্রায় ৩৮ লাখ কপি ছাপানো হচ্ছে। এর বেশির ভাগই ইতোমধ্যে ছাপা হয়ে গেছে।
আগের শিক্ষাবর্ষের বইয়ের সঙ্গে তুলনা করলে প্রজ্ঞার প্রতীক নিয়ে পরিবর্তনের ধারাটি আরও স্পষ্ট হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন এনে অন্তর্বর্তী সরকার ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফিরে যায়। সেই অনুযায়ী, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের জন্য পরিমার্জিত ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বইয়েও প্রজ্ঞার স্তরে দাঁড়িপাল্লার ছবি ছিল।
তবে চলতি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের হাতে থাকা বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের ছবি। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে আবার দাঁড়িপাল্লার ছবি ফিরে আসে। এ নিয়ে বিতর্কের পর এবার প্রতীকটি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
টিবিআই/আরআর